বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ ভাগ শিক্ষার্থী ভুগছে বিষণ্নতায়, ৭০ ভাগ মানসিক চাপে

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে বিষণ্নতা, মানসিক চাপ আর উদ্বেগ বাড়ছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে; শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা আর মানসিক চাপে রয়েছে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী। করোনা মহামারি কোভিড-১৯ চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের বিষণ্নতা এবং মানসিক চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই মানসিক চাপ এবং হতাশার পেছনে অন্যতম কারণ করোনা মহামারিতে কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাহীনতা। এক গবেষণা করে এমনটি তথ্য পেয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) একদল গবেষক। গতকাল এসব তথ্য তুলে ধরেন গবেষণা দলের প্রধান ও শাবিপ্রবির পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জামাল উদ্দিন। গবেষণা দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী উপমা চৌধুরী, মো. আহসান হাবিব শুভ্র এবং সৈয়দ মো. ফারহান। গবেষণার বিষয়ে অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, আমাদের গবেষণার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের করোনা মহামারিতে ভবিষ্যত কর্মজীবন নিয়ে মানসিক অবস্থা এবং হতাশা বৃদ্ধি পায় কিনা তা যাচাই করা।


প্রায় দুই বছর গবেষণা শেষে সম্প্রতি গবেষণাটি আন্তর্জাতিক জার্নাল এ প্রকাশিত হয়। এই গবেষণায় শাবিপ্রবিসহ দেশের ৬২ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয়, চতুর্থ, এবং মাস্টার্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের ৮০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে বিষন্নতা এবং রয়েছে মানসিক চাপ ৭০ ভাগ। ভবিষ্যত কর্মজীবনের পাশাপাশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয় এ মানসিক চাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এতে ছেলেদের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীরা দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বিষন্নতা এবং মানসিক চাপে ভোগেন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের ধারণা কোভিড-১৯ এর কারণে তাদের ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান অনিশ্চিত তাদের বিষন্নতা তুলনামূলকভাবে বেশি। গবেষণায় থেকে দেখা যায়, যে উপযুক্ত সময়ে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা এবং স্নাতক শষ হওয়া সময়ের সঙ্গে নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে বেশিরভাগ প্রাইভেট কোম্পানি উদ্ভাবনীমূলক, সহজেই মানিয়ে নিতে পারে এমন যুবকদের বেশি পছন্দ করে। তাই শিক্ষার্থীদের স্নাতক বিলম্ব হওয়া তাদের এই সুযোগও বিলম্ব হচ্ছে, যা তাদের অধিক হতাশা এবং মানসিক চাপে রাখছে।

গবেষণা দলের প্রধান বলেন, গবেষণায় অংশগ্রহণকারী পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে যাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিভাগ ইন্টার্নশিপের সুযোগ দিয়ে থাকে অথবা ইন্টার্নশিপ তাদের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকে সেসব শিক্ষার্থীরা বাকি শিক্ষার্থীদের তুলনায় ৩৬% কম বিষন্নতা এবং মানসিক চাপে ভোগে। যা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিভাগগুলো যেকোনো ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কোনো কার্যক্রম বা কোর্সের ব্যাবস্থা করে অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন মাঠ পর্যায়ের কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকে সেসব শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত কর্মজীবন নিয়ে বিষন্নতা কম থাকে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ ধরনের কার্যক্রমের সুযোগ করে দেয় সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বিষন্নতা ৪৬% কম পাওয়া যায়। এদিকে গ্র্যাজুয়েশন বিলম্বিত হওয়া, উপযুক্ত চাকরি পাওয়ার জন্য দক্ষতার অভাব, স্টার্টআপ প্ল্যান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইন্টার্নশিপ সুবিধা না পাওয়া হতাশা ও মানসিক চাপে রাখার সবচেয়ে বড় কারণ। গ্র্যাজুয়েশনের পর অনলাইন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রোগ্রাম এবং ইন্টার্নশিপ প্রদানের মাধ্যমে পরিস্থিতি রোধ করতে সরকারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ও সহযোগিতা থাকা উচিত, যা তাদের মানসিক চাপ ও হতাশা কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতার ফলের বলে মনে করছেন গবেষকরা।

গবেষণায় উঠে এসেছে, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ এবং হতাশা থেকে মুক্ত থাকতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রোগ্রাম আয়োজন করা উচিত। মূলত এই মানসিক চাপ, হতাশা বা বিষন্নতার পিছনে যে কারণগুলো যেমন তাদের দক্ষতার অভাব এবং তাদের ইন্টার্নশিপ এর সুযোগ প্রদান করা হয়না, সেক্ষেত্রে বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারকে একযোগে কাজ করতে হবে। মেয়ে গ্র্যাজুয়েটরা ছেলেদের তুলনায় অধিক বিষন্নতার কারণ তাদের কর্মক্ষেত্রের অভিজজ্ঞতা বা কর্মজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ কম। যেসকল শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যক্রম ভিত্তিক পড়াশোনা করে থাকে তাদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যত কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকে না সেক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থীদের হতাশা এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। তাই শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগের মাধ্যমে মানসিক হতাশাগুলো কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করা সম্ভব। পরিশেষে তিনি বলেন, গবেষেণাটি আমরা সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত করেছি। তাই আমাদের গবেষণায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ছিল। তাই ভবিষ্যতে সরকার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে ফান্ডিং হলে এ গবেষণাকে আরও বৃহত্তর পরিষরে করা সম্ভব। এতে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি কর্মদক্ষতা সম্পন্ন করে গড়ে তোলা যাবে।