সফলদের প্রিলি পাসের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ

৪৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষাকে সামনে রেখে নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রার্থীদের জন্য পরামর্শ দিয়েছেন ৪০তম বিসিএসে প্রশাসন, পররাষ্ট্র, পুলিশ ও সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ৪ নবীন কর্মকর্তা

বেশি উত্তরের চেয়ে নির্ভুল করাটাই জরুরি

এ এইচ এম আজিমুল হক রিফাত, প্রশাসন (সুপারিশপ্রাপ্ত), মেধাক্রম-৫, ৪০তম বিসিএস

বিসিএসের তিনটি ধাপের মধ্যে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনিশ্চিত।
আমি প্রিলিমিনারির আগে যেসব স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করেছিলাম, তার কিছু শেয়ার করছি।

♦ প্রথমত, নম্বর বণ্টনের দিকে নজর দিন। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ২০০-তে আপনার ১৬০+ পেতে হবে না।

১১৫-১২০ নম্বরকে নিরাপদ বিবেচনা করলেই যথেষ্ট।
এ ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে (সাধারণ বিজ্ঞান-১৫, কম্পিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তি-১৫, গাণিতিক যুক্তি-১৫, মানসিক দক্ষতা-১৫) মোটামুটি নিশ্চিত নম্বর পাওয়া সম্ভব সেগুলোতে জোর দিন। বাংলা-ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যেই ৭০ নম্বর বরাদ্দ, বিস্তারিত সিলেবাস অনুসরণ করে চেষ্টা করুন এগুলো থেকে সর্বোচ্চ নির্ভুল নম্বর তোলার।

♦ দ্বিতীয়ত, এই মুহূর্তে দিনে কমপক্ষে একটি করে মডেল টেস্ট দিন। দিনে অন্তত এক ঘণ্টা প্রশ্নব্যাংকের পেছনে ব্যয় করুন।
♦ তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ এড়িয়ে চলুন। প্রিলির জন্য যত রকম বই-নোট-শিট সংগ্রহ করেছেন, এসবের তালিকা সংক্ষিপ্ত করুন। কোচিং/প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রকাশিত অতিরিক্ত তথ্যবহুল বইপত্র প্রিলি প্রার্থীদের বিভ্রান্ত করে।
♦ চতুর্থত, নেগেটিভ মার্কিং থাকায় পরীক্ষার হলে বেশি উত্তর না করে বেশিসংখ্যক নির্ভুল উত্তর করার চেষ্টা করুন।
♦ পঞ্চমত, পরীক্ষার সময় যে বিষয় দিয়ে শুরু করবেন আর যেগুলো পরে উত্তর করবেন বলে ঠিক করেছেন, বাসায় মডেল টেস্ট দেওয়ার সময় এই পরিকল্পনা অনুযায়ীই সময় বণ্টন করে অনুশীলন করুন।

পড়াশোনার পাশাপাশি কৌশল খাটান

মো. মইনুল হোসেন, পররাষ্ট্র (সুপারিশপ্রাপ্ত), ৪০তম বিসিএস

প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রমাণ করতে চাইলে পড়াশোনার পাশাপাশি দরকার কিছু কৌশল অবলম্বন করা। এর পাশাপাশি দরকার কিছু ভুল থেকে নিজেকে বিরত রাখা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু সাধারণ ভুল বর্ণনা করছি—

প্রথমত, প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় বিষয়ভিত্তিক নম্বর পূর্ব অনুমান করে রাখা। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে অনেকেই পার পেয়ে গেলেও এটি অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে যেতে পারে। যেমন—আপনি পরীক্ষার আগেই টার্গেট করে রাখলেন যে ইংরেজিতে আপনি অন্তত ২৫ পাবেন। ধরা যাক, সেবার ইংরেজি প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন এলো। আপনি হয়তো সর্বোচ্চ ২০ নম্বর পারেন কিন্তু নিজের টার্গেট ফিলআপ করতে আপনি আন্দাজে আরো কিছু দাগালেন। অথচ দেখা গেল সেবার বাকি সব বিষয়ে সহজ প্রশ্ন আসায় আপনি ইংরেজিতে ২০ উত্তর করলেই সব মিলিয়ে পাস মার্ক তুলতে পারতেন।

দ্বিতীয়ত, মাথায় রাখতে হবে আপনি যদি ৬০-৭০টি প্রশ্নের উত্তর না পারেন তাও আপনি টিকতে পারেন। তাই পুরো প্রশ্ন পড়া শেষ করে যদি দেখেন আপনি ১১০-১২০ নম্বরও উত্তর করতে পারছেন না, শুধু তখনই ধারণা করে উত্তর দেওয়ার ঝুঁকিটা নিতে পারেন! এর আগে নয়।

পরীক্ষার আগের ২০ দিন বিষয়বণ্টন করে পড়েছিলাম

নূর ইসরাত জাহান তাজিন, সাধারণ শিক্ষা (সুপারিশপ্রাপ্ত), মেধাক্রম-১ (ইংরেজি), ৪০তম বিসিএস

প্রথমেই যা প্রয়োজন তা হলো নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস রাখা। পরীক্ষার আগে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, যা প্রস্তুতি ও পরীক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রিলির আগে আমি যা যা করেছিলাম—
♦ প্রতিটি বিষয়ের জন্য একাধিক সহায়ক বই অনুসরণ করলেও আমি পরীক্ষার আগে মানসিক চাপ কমানোর জন্য টেবিল থেকে অযাচিত বইগুলো সরিয়ে ফেলেছিলাম।
♦ পরীক্ষার আর কদিন বাকি আছে তা দেখার জন্য ক্যালেন্ডারে বড় করে মার্ক করে রেখেছিলাম।
♦ কোন দিন কতটুকু পড়ব তা আগের দিন রাতেই ঠিক করে রাখতাম।
♦ প্রতিদিন একাধিক বিষয় না পড়ে একটি বিষয় শেষ করেছি। পরীক্ষার আগের ২০ দিনকে আমি নিম্নোক্তভাবে ভাগ করে নিয়েছিলাম—
বাংলা-৩ দিন, ইংরেজি-২ দিন, বাংলাদেশ বিষয়াবলি-২ দিন, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি-২ দিন, বিজ্ঞান + কম্পিউটার-৩ দিন, ভূগোল-১ দিন, মানসিক দক্ষতা (শুধু বিগত + কিছু নিয়ম)-১ দিন, সুশাসন-১ দিন, সাম্প্রতিক + বিগত-৩ দিন, সিলেক্টিভ কিছু টপিক রিভিশন-২ দিন।

♦ প্রিলিমিনারির নম্বর যেহেতু যোগ হয় না, তাই এখানে সব বিষয় কিংবা সব প্রশ্ন পারতে হবে এমনটা নয়। তাই পরীক্ষার আগে আমি টাইম কনজিউমিং টপিকগুলো বাদ দিয়ে সিলেবাস নিজের মতো ছোট করে নিয়েছিলাম এবং টার্গেট মার্ক ক্যারি করার জন্য কিছু স্ট্রং জোন বাছাই করেছিলাম, যেগুলো আগে থেকেই ডিটেইল পড়া ছিল।
♦ আমার টার্গেট মার্ক ছিল ১৩০। এ জন্য বিষয়ভিত্তিক নম্বর বিভাজনগুলো ছিল এরূপ—
বাংলা (২৬/৩৫), ইংরেজি (২৬/৩৫), বিজ্ঞান + কম্পিউটার (২২/৩০), বাংলাদেশ + আন্তর্জাতিক (৩০/৫০), গণিত + মানসিক দক্ষতা (১৬/৩০), ভূগোল + সুশাসন (১০/২০)
আপনারা নিজেদের প্রস্তুতি ও স্ট্রং জোন অনুযায়ী টার্গেট মার্ক ঠিক করে নেবেন।
♦ সময় ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। কেননা পরীক্ষার হলে সময় অব্যবস্থাপনার জন্য ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। এর জন্য পরীক্ষার আগে অবশ্যই ৫-১০টি পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট (১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে) দেওয়া উচিত।
♦ পরীক্ষার দেড় মাস আগে থেকেই মডেল টেস্ট সলভ করেছি। এ ক্ষেত্রে আমি সাবজেক্ট ধরে এমসিকিউ সলভ করেছি। এতে প্রতিটি বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো ক্লিয়ার হয়ে যায়।
এ সময় আমি যে টপিকগুলো বারবার ভুল করতাম তা আলাদা করে লিখে রেখেছিলাম এবং পরীক্ষার আগের এই ২০ দিনে বিষয়ভিত্তিক প্রিপারেশনের
সময় ওই টপিকগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পড়েছি। একইভাবে যে টপিকগুলো থেকে বেশি বেশি প্রশ্ন আসে সেগুলোও আলাদা করে পয়েন্ট আউট করা ছিল।
♦ পরীক্ষার হলে কোন বিষয়ের পরে কোন বিষয় উত্তর করব তা আমি আগে থেকেই নিম্নোক্তভাবে অনুশীলন করেছি—
বাংলা>ইংরেজি >বিজ্ঞান >কম্পিউটার > বাংলাদেশ> আন্তর্জাতিক >ভূগোল >মানসিক দক্ষতা> সুশাসন> গণিত।
♦ একদমই না জানা প্রশ্নের উত্তর করার লোভ সামলাতে হবে। মডেল টেস্ট দিয়ে এটি আয়ত্তে আনতে হবে।
♦ যেসব টপিক বারবার পড়লেও মনে থাকেনি তা আমি এ সময় আর পড়িনি।
♦ বিগত প্রশ্ন (বিসিএস ও অন্যান্য) রিভিশনের জন্য আমি জব সলিউশনের পরিবর্তে বিগতভিত্তিক একটি ডাইজেস্ট রিডিং দিয়েছিলাম।
♦ বরাবরই বই দাগিয়ে পড়ি, যা পরীক্ষার আগে স্বল্প সময়ে রিভিশন দিতে বেশ সহায়ক।
♦ সাম্প্রতিকের জন্য পরীক্ষার আগের (৬ থেকে ১ মাস আগ পর্যন্ত) তথ্যগুলো পড়েছি।
♦ কারো যদি গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো আলাদা করা না থাকে, তাহলে এখনই সিলেবাস, বিগত প্রশ্ন ও বিষয়ভিত্তিক বইয়ের সহায়তা নিয়ে সেগুলো বের করা উচিত।

নেগেটিভ মার্কিংয়ে সতর্ক থাকুন

কাজী ফাইজুল করীম, পুলিশ (সুপারিশপ্রাপ্ত), মেধাক্রম-১, ৪০তম বিসিএস

এই সময়ে প্রথম যে কাজটি করা উচিত তা হলো যেসব বিষয়ে প্রার্থী দক্ষ ও পারদর্শী সেসব বিষয় ভালোভাবে রিভিশন দেওয়া যেন এসব টপিক থেকে আসা সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়।

তারপর যেসব বিষয় কম পড়া হয়েছে বা প্রার্থীর দুর্বলতা রয়েছে, সেসব বিষয়ের ওপর বিষয়ভিত্তিক বই থেকে বা সময় কম থাকলে ডাইজেস্ট থেকে কয়েকবার রিভিশান দেওয়া।

বিসিএস প্রিলিমিনারিতে বেশির ভাগ প্রার্থী বাদ পড়ে নেগেটিভ মার্কিংয়ের জন্য। তাই পরীক্ষার হলে এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। বিগত বিসিএসগুলোর প্রশ্ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—কিছু প্রশ্নে প্রায় কাছাকাছি উত্তর দেওয়া থাকে। এসব প্রশ্ন প্রার্থীর মধ্যে কনফিউশন তৈরির জন্যই দেওয়া থাকে। তাই এসব প্রশ্নের উত্তর করতে গিয়ে সময় নষ্ট না করাই ভালো। নিশ্চিত না হয়ে স্রেফ অনুমাননির্ভর উত্তরের বেলায় সতর্ক থাকতে হবে।

বাসায় ঘড়ি ধরে মডেল টেস্ট দিয়ে নিজেকে যাচাই করতে হবে। যেসব বিষয়ে দুর্বলতা চোখে পড়বে, সেগুলো বারবার রিভিশন দেওয়ার চেষ্টা করবেন। শেষ সময়ে নতুন কোনো টপিক না পড়াই ভালো। তবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ টপিক বাদ পড়ে গেলে সেটি নোট করে প্রস্তুতি নিতে হবে।

মনে রাখবেন, বিসিএস প্রিলির সব প্রশ্নের উত্তর আপনার জানা থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। তাই কোনো প্রশ্ন না পারলে ঘাবড়ে যাবেন না। কোনো কোনো বিষয়ের ওপর খুব কঠিন প্রশ্নও হতে পারে। কিন্তু ঘাবড়ানো যাবে না। কারণ আপনাকে ২০০তে ১৫০ পেতে হবে না। নেগেটিভ মার্কিং এড়িয়ে জানা প্রশ্নগুলো ভালোভাবে উত্তর করতে পারলেই আপনি প্রিলিমিনারিতে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে পারেন।